শুক্রবার | ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি | সন্ধ্যা ৭:১৬
Home / কৃষি সংবাদ / টাঙ্গাইলে মধুতে মধুময় মৌয়ালরা

টাঙ্গাইলে মধুতে মধুময় মৌয়ালরা

‘মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচি নাচি, দাঁড়াও না একবার ভাই। ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে, দাঁড়াবার সময় তো নাই।’ ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি দেখে ছোটবেলার ওই ছড়াটির প্রতিফলনই যেন টাঙ্গাইলের সরিষার ক্ষেতগুলোতে দেখা যাচ্ছে।

এবার ইরি-বোরো রোপনের আগে জমিতে বপন করা সরিষার বাম্পার ফলন হয়েছে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলায়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে পড়া পলিতে সার-কীটনাশকও তেমন লাগেনি সরিষা চাষীদের। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে সরিষার ক্ষেত। হলুদ ফুলে হাসছে মাঠ। আর এই ফুল মধু উত্পাদনের প্রধান উত্স। যতদূর চোখ যায়; শুধু হলুদময়।

টাঙ্গাইলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন দৃষ্টি নন্দনভাবে শোভা পাচ্ছে হলুদের সমারোহ। ফুটেছে সরিষার ফুল। তাই মৌমাছিদের যেন কোনো ফুরসত নেই। মহাব্যস্ত এখন তারা মধু আহরণে। ভোঁ ভোঁ শব্দ তুলে দলে দলে তারা ছুটে যাচ্ছে দূর বহু দূর। উড়ে উড়ে ফুল থেকে মধু চুষে নিয়ে আবার আসছে ফিরে; নীড়ে। সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণে ব্যস্ত মৌচাষিরা। মাঠে মাঠে এখন চলছে মধু সংগ্রহের কাজ। মধুতে মধুময় মৌচাষিরা। মাঠের পর মাঠ হলুদ রঙে ভরে গেছে শীতকালীন সোনার শস্য সরিষার ক্ষেত।

টাঙ্গাইলে রবি মৌসুমে সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মৌচাষিরা টাঙ্গাইলের সরিষা ক্ষেতের আশপাশে মধু সংগ্রহের জন্যে ভিড় করেছেন। এ বছর জেলার বিভিন্ন স্থানে সাত হাজারেরও বেশি মৌ-বাক্স স্থাপন করেছেন জানিয়েছেন মধুচাষিরা। এখান থেকে সংগৃহিত মধু তারা বাজারে বিক্রি করে লাভবানও হচ্ছেন। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা আধুনিক না হওয়ায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মৌয়ালরা।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চলতি মৌসুমে ২৮ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। বিপুল পরিমান সরিষার আবাদের কারণে জেলার ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৌচাষিরা এবারও টাঙ্গাইলে মধু সংগ্রহের জন্যে এসেছেন।

জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যেই কমবেশি সরিষার আবাদ হয়েছে। এদের মধ্যে সখীপুর, বাসাইল, মির্জাপুর, গোপালপুর, ধনবাড়ি, ঘাটাইল, দেলদুয়ার, ভূঞাপুর, নাগরপুরসহ ১০টি উপজেলায়ই সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষিরা সারিবদ্ধভাবে মৌ-বাক্স স্থাপন করেছেন। মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌ-বাক্সে জমা করছে। আর মৌচাষিরা বাক্সে জমা হওয়া মধু প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ওই মধু ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে বিদেশেও। মৌচাষের মাধ্যমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নতি না হওয়ায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জানিয়েছেন চাষিরা। কয়েক বছর আগেও টাঙ্গাইলের সরিষা চাষিরা ফলন কম হবে এ ধারণায় সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌ-বাক্স স্থাপনে বাঁধা দিতেন। জেলার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে তাদের সে ধারণা আজ পাল্টেছে। এখন মৌ-বাক্স স্থাপনে বাঁধা না দিয়ে বরং উত্সাহ যোগাচ্ছেন তারা।

ভূয়াপুরের মৌ-চাষি ঝুমুর আলী বলেন, তার খামারে ৭৫টি বাক্স বসানো হয়েছে। এক মাসে এখান থেকে প্রায় ৩০ মণ মধু উত্পাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি কেজি মধু ৩০০-৪০০টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করা যায় বলে জানান তিনি। গাজীপুর থেকে আসা মৌ-চাষি গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমি ৭০টি বাক্স বসিয়েছি। সপ্তাহে ৭ মণ মধু উত্পাদন হয়েছে।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বড় বাসালিয়া গ্রামে মধুচাষ করতে আসা সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার নিত্যানন্দ মণ্ডল বলেন, নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মধু সংগ্রহ শুরু হলেও এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একমাস বিলম্বে মধু সংগ্রহ শুরু করতে হয়েছে। এ বছর তার তিন টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা আশা করছেন তিনি। মির্জাপুর উপজেলার পাথরঘাটায় মৌচাষ করতে আসা সাতক্ষীরার ইসহাক উদ্দিন জানান, তিনি গাজীপুরে খামারের কর্মচারী হিসেবে মধু চাষ শুরু করেন। ২০১৫ সালে তিনি প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫০টি মৌ-বাক্স দিয়ে নিজেই মধু চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার ২৬টি মৌ-বাক্সের সারি আছে। প্রতি বাক্স থেকে মৌসুমে সর্বোচ্চ ১০০ কেজি মধু সংগ্রহ করতে পারেন তিনি।

মৌচাষীরা জানান, বিসিক থেকে মৌচাষে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। মৌমাছির বংশ বিস্তার, মধু সংগ্রহ ও ফ্রেম থেকে মোম পাওয়া যায় তা সবই বিক্রি করা যায়। সরিষা ফুলের মধু যেমন খাঁটি তেমনি সুস্বাদু। মানের দিক থেকেও উন্নত হয়। এ মৌসুমে মধুর চাহিদাও বেশি থাকে। আবহাওয়া ভালো থাকলে মধু উত্পাদনে ব্যাপক সাফল্য হয়। তবে মৌমাছি সংরক্ষণে অনেক সময় চাষিদের সংকটে পড়তে হয়। বিশেষ করে প্রচন্ড শীতে অনেক মাছি মারা যায়।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, এবার জেলায় সরিষার বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে মৌচাষিরা এ জেলা ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে মধু সংগ্রহে এসেছেন। মধুতে উচ্চমাত্রার প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক আছে। এ বছর জেলায় ২৮ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল জেলার ১০টি উপজেলায় সাত হাজারের বেশি মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুন
Share

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মির্জাগঞ্জে বিনামূল্যে সার বিতরন ।

বিশেষ প্রতিনিধি,মির্জাগঞ্জ অফিসঃ পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উদ্যোগে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে ...