বুধবার | ১লা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৬শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি | রাত ৮:৫৬
Home / সারাদেশ / বরিশাল বিভাগ / কাঠালিয়া সরকারি কলেজের এইচএসসির ফরম পূরণে বাড়তি টাকা আদায়, অধ্যক্ষ মাহতাব উদ্দিনের খুটির জোর কোথায়।

কাঠালিয়া সরকারি কলেজের এইচএসসির ফরম পূরণে বাড়তি টাকা আদায়, অধ্যক্ষ মাহতাব উদ্দিনের খুটির জোর কোথায়।

কাঠালিয়া প্রতিনিধিঃ

* ফরম পূরণে গলাকাটা ফি আদায়ের অভিযোগ মিলেছে।
* সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং ফির ধকল।
* টাকার কথা ফোনে বলা যাবে না : অধ্যক্ষ
* বাড়তি অর্থ দিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা।
* টাকা না দিলে ব্যবহারিক নম্বর মেলে না।
* ইউএনও’র নামকরেও টাকা আদায় করা হয়।

রক্ষক,বক্ষকের দূর্নীতিতে দেশ যেন ছেয়ে যাচ্ছে। সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে সেই বক্ষকদের জয়-জয়কার। কিন্তু সেই বক্ষকের ভাইরাসে যখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সমাজ আক্রান্তের খবর পাওয়া যায় তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে জাতির জন্য সামনে এক ভয়াভয় দিন অপেক্ষমান। অভিশপ্ত শিক্ষক সমাজের শিক্ষা বাণিজ্যের হাত ধরে রচিত হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্খা অকাল চিতা, রচিত হয় জাতিয় স্বপ্ন ধ্বংসের কালো ইতিহাস। কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের চোখে আঙ্গুল দিয়ে লক্ষটাকা কামানো কিছু অসাধু শিক্ষক সমাজের নৈরাজ্য সত্যিই জাতির জন্য মারাত্মক হতাশাজনক। সরকারের কড়া নিষেধাজ্ঞাতেও এই শিক্ষাবাণিজ্য প্রথার লাগাম ধরা যাচ্ছে না যেন কোন ক্রমেই।
এবারের অভিযোগ এইচ এস সি পরীক্ষার ফরম পূরনের জন্য অতিরিক্ত ফি আদায়। শুধু অতিরিক্ত বললে একটু ভূলই হবে, বরং মাত্রারিক্ত ফি আদায়। মাত্রাতিরক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে ঝালকাঠির কাঠালিয়া সরকারি তফাজ্জল হোসেন (মনিক মিয়া) ডিগ্রী কলেজে। ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরনে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। একদিকে ফরম পূরণে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। আবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিং ফির ধকল। উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজটির ফি আদায়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডের কোনও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। অতিরিক্ত ফি আদায় নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। কলেজের বিভিন্ন খাত ও বোর্ডের নির্ধারিত ফি বেশি দেখিয়ে গলাকাঁটা ফি আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ মিলছে।
বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানায়, কেন্দ্র (ব্যবহারিক ফি সহ) এবং বোর্ড ফি মিলিয়ে এইচএসসির ফরম পূরণে বিজ্ঞান বিভাগে বোর্ড ফি ১৬৯৫ টাকা, কেন্দ্র ও ব্যবহারিক ফি ৮০৫ টাকা মোট ২৫০০ টাকা। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে বোর্ড ফি ১৪৯৫ টাকা, কেন্দ্র ও ব্যবহারিক ফি ৪৪৫ টাকা মোট ১৯৪০ টাকা । মানবিক বিভাগে বোর্ড ফি ১৪৯৫ টাকা, কেন্দ্র ও ব্যবহারিক ফি ৪৪৫ টাকা মোট ১৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, কাঠালিয়া তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) ডিগ্রী কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় ফরম পূরণে প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একহাজার টাকা করে কোচিং ফি আদায়সহ বিভিন্ন খাত দেখিয়ে বোর্ড নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত টাকা আদায়ের করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে এক থেকে দুই বিষয়ে ফেল করা (অনিয়মিত) শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও ফরম পূরণে আদায় করা হয়েছে ৩৫ শ টাকা থেকে ৩৮ শ টাকা পর্যন্ত। একই ভাবে মান উন্নয়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও আদায় করা হয়েছে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। এরাও মাফ পাচ্ছে না কোচিং ফি ও বকেয়া থেকে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে ফরম পূরণের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অতিরিক্ত টাকা কোন রশিদেই উল্লেখ করা হয়নি বরং রশিদে ৩ শ/৪শ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার একাধিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা( ইউএনও) কে টাকা দিতে হবে এমন অযুহাতে টাকা আদায় করা হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা মূখ খুলতে নারাজ কারন তাদের বলা হয়েছে ইউএনওকে টাকা না দিলে পরীক্ষা ভালো হবে না।
অধ্যক্ষের একান্ত অনুসারী কয়েকজন অধ্যাপক দিয়ে ফরম পূরনের উপ-কমিটি গঠন করে এ কমিটির সদ্যদের উপর অনেকটা দায়ভার দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানে বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও উপজেলা অন্যান্য কলেজকে হার মানিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কলেজ অধ্যক্ষ মাহতাব উদ্দীন।
এভাবে প্রতি ফরম পূরনের মৌসুমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। দূর্নীতি ও পরীক্ষা কেন্দ্রে চরম অনিয়মে কারণে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড কাঠালিয়া তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) ডিগ্রী কলেজ ২০১৪ সালের অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্র বাতিল করে করে দেয়। পরে অনেক চেষ্টা ও শর্ত সাপেক্ষে কেন্দ্র পূর্নবহাল রাখেন শিক্ষা বোর্ড তবে কেন্দ্রের ভেন্যু পরিবর্তন করে কাঠালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে করা হয়।
পরীক্ষা কেন্দ্রে অহেতুক হয়রানীর শিকারের ভয়ে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক পরীক্ষার্থীরা জানায়, ফরম পূরণে বোর্ড ফি বাদে কোচিং বাবদ একহাজার টাকা, বকেয়া বেতন, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কল্যাণ ট্রাষ্ট, মসজিদ চাঁদা, ভর্তি ফি,বিদুৎ বিল, বেতন, পরীক্ষা ফি ও সেসন চার্জসহ ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা প্রত্যেককে কলেজে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া ফরম পূরণের সময়ে কেন্দ্র ও ব্যবহারিক ফি নেয়া হলেও প্রবশপত্র নেয়ার সময় আবারো ৪শ থেকে ৫শ টাকা ফি নেয়া হয় বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। সেই সাথে ব্যবহারিক পরীক্ষার প্রতিটি খাতা স্বাক্ষর করাতে খাতাপ্রতি ঐ বিভাগের অধ্যাপককে ৩ শ থেকে ৪ শ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। টাকা না দিলে ব্যবহারিক পক্ষিার পূর্ন নম্বর প্রদান করেন না। অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীরা টাকা কমানোর জন্য আবেদন করার মতোও সুযোগ দেয়া হয় না এ কলেজে। কিছু শিক্ষার্থীদের বিশেষ অকুতি মিনতি ও  স্থানীয় নেতাদের বিনিনয় অনুরোধে কিছু টাকা বাদ দিলেও পরবর্তীতে ঐ টাকা পরিষোধ না করা পর্যন্ত ঐ শিক্ষার্থী পরিক্ষায় অশংগ্রহন করতে পারে না।
সরেজমিনে দেখাগেছে, অতিরিক্ত ফি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। আবার অনেকেই তাদের ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত শিক্ষা জীবনের কথা চিন্তা করে দার-দেনা করে টাকা করে দিতে বাধ্য হয়েছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা গেছে। জনা যায়, কলেজে কতৃপক্ষ নিজেদের পকেট ভারি করতে বিভিন্ন নয়া কৌশালে নানান অজুহাতে অভিবাকদের পকেট থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। তাই এবারও ফরম পূরণের সাথে বাড়তি টাকা আদায় করতে সরকারি নিষেধ উপেক্ষা করে কোচিং ফির নামে বাড়তি টাকা আদায়ের নতুন ফন্দি তৈরি করছে। যে প্রক্রিয়ায় শিক্ষকরা ইতিমধ্যে তাদের পকেট ভারি করার র্টাগেট পূরন করছে ।
নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের কলেজে তো নিয়মিত ক্লাসই হয় না। সকাল ৮ টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত স্যারেরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রাইভেট পড়ান। আর প্রাইভেট না পড়লে ব্যবহারিকে নম্বর দেয় না। আমার প্রশ্ন যেখানে নিয়মিত ক্লাসই হয় না সেখানে বাড়তি ক্লাসের নামে আমাদের কাছথেকে টাকা নেয় কিভাবে?। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রিন্স হাওলাদার আবির লেখেন, ওটা কলেজ না টাকা নেওয়ার মেসিন, কোন বকেয়া ছাড়াই, ইমপ্রæমেন্ট পরিক্ষার জন্য ফরম ফিলাপে ফরম সহ ৩৭০০টাকা দিতে হলো। যে যাই বলো কোন লাভ হবে না মনে হয়। দেবাশিস মন্ডল লিখছেন দুই বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছি ২০১৯ সালে ১৯ শ টাকা দিতে হয়েছে।
একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, শিক্ষকরা টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, নির্ধারিত ফি দিতেই তাদের কষ্ট হয়। সেখানে বাড়তি অর্থ দেওয়া এক প্রকার দুঃসাধ্য। কিন্তু বাধ্য হয়ে দিতে হচ্ছে।
কাঠালিয়া উপজেলার অধিকাংশ পরিবারই স্বল্প আয়ের ও কৃষিনির্ভর। এখন পর্যন্ত সোনালী, আমন পাকেনি, ঘরে উঠেনি ধান, এ অবস্থায় সন্তানের ফরম পূরণে বাড়তি টাকা গুনতে অভিভাবদের হিমশিম খেতে হয়েছে করতে হয়েছে দার-দেনা।
ফরমপূরণ উপ-কমিটির সদস্যদের দাবি নিয়ম মেনেই ফরম পূরণ করা হচ্ছে এবং কোচিং ফি আদায় করা নিয়ম আছে। ফরম পূরণের জন্য অভিভাবক সেজে অধ্যাক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তারা টাকা নিয়ে কলেজে যাওয়ার জন্য বলেন আর বলেন টাকার কথা ফোনে বলা যাযে না বলে জানান। সাংবাদিক পরিচয়ে অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিষয়ে অধ্যক্ষ মাহতাব উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে ফোনটি কেটে দেন।
বোর্ড নির্ধারিত ফির বেশি অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকন্দ মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দিন। তিনি বলেন, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে অভিযোগ পেলে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোচিং ফি’র নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তার সাথে আলাপ করলে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের ফলাফল ভালো করা শিক্ষকদের দায়িত্ব। প্রয়োজনে দুর্বল ছাত্রছাত্রীকে বিশেষ ক্লাস করাতে পারবে। কিন্তু কোনো টাকা নিতে পারবে না।
অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিষয়ে দূর্নীতি দমন কমিশন দুদক এর ১০৬ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ করলে তারা বলেন, সরকারী কলেজে অতিরিক্ত ফি আদায়ের কোন সুযোগ নাই। আপনার আমাদের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় অভিযোগ করুন।

পোস্টটি শেয়ার করুন
Share

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ঝুঁকিতে মনপুরা লঞ্চ ঘাট এলাকা

জিহাদ হোসেন, মনপুরা উপজেলা প্রতিনিধি!! ১নং মনপুরা ইউনিয়ন, এক ঐতিহ্যবাহি এলাকা। শিক্ষা, ...